ভারতীয় কৃষির ইতিহাস কয়েক সহস্রাব্দ পুরোনো, এবং বেদে কৃষি-পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ার অত্যন্ত বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। প্রাচীন ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক নথিতে জমিকে তার উৎপাদন-ক্ষমতা অনুসারেও শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে: উর্বর, অনুর্বর, মরু, পতিত, তৃণাচ্ছাদিত, কর্দমাক্ত, জলময়, জলসংলগ্ন, নুড়ি ও চুনাপাথরের টুকরোয় ভরা, বালুময়, নদীর জলে সেচযুক্ত এবং বৃষ্টিনির্ভর। ধান, গম, যব, ওটসহ বিভিন্ন প্রধান খাদ্যশস্য; মসুর ও ছোলাসহ ডালজাতীয় শস্য; তিল, তিসি, কুসুম, সরষে, রেড়ি, মুগ, কলাই, কুলথ, অড়হর, মটর, খেসারি, মেথিসহ ভোজ্য বীজ; তুলা ও আখের মতো অর্থকরী ফসল; এবং কুল, আঙুর, খেজুর, কাঁঠাল, আম, তুঁত, জামসহ নানা ফলের কথা নথিভুক্ত হয়েছে। এগুলি শুধু অভ্যন্তরীণ ভোগের জন্য নয়, প্রক্রিয়াকরণ ও রপ্তানির জন্যও উৎপাদিত হতো।

প্রাচীন রাজবংশগুলিও বৃষ্টি ও নদীর জল সঞ্চয়ের জন্য পুকুর ও বাঁধ; কৃষিজমিতে জল নিয়ে যাওয়ার জন্য খাল-নালা; ফসলের জলপথে পরিবহণের জন্য খাল; এবং কৃষিপণ্য রপ্তানির সুবিধার জন্য বন্দর-ঘাট সহ বিস্তৃত কৃষি-অবকাঠামো গড়ে তুলেছিল। এমন বহু কাঠামো (যা গল্পকথা, লিপি, বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণকাহিনি, ভাস্কর্য ও চিত্রকলায় নথিভুক্ত) ভারতের নানা অংশে আজও ব্যবহৃত হচ্ছে। চিনি প্রথম ভারতেই স্ফটিকায়িত করা হয়েছিল, এবং প্রায় অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ভারত ছিল এর অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী। ব্রিটিশরা এই প্রযুক্তি এবং চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের আফ্রিকা, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ, এমনকি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলসহ বিশ্বের আরও বহু জায়গায় নিয়ে যায়। তবে তারা পরিকল্পিতভাবে কৃষিভিত্তিক শিল্পগুলিকে ভেঙে দেয় এবং কৃষকদের এমন পণ্য উৎপাদনে বাধ্য করে যার উপর তারা কর বসাত এবং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত অতি নিম্ন দামে কিনে নিত, যাতে নিজেদের কারখানায় প্রক্রিয়াকরণ করে মুনাফা সর্বাধিক করতে পারে। ব্রিটিশ নথিতেই বলা আছে যে এই ধরনের কার্যকলাপ ভারতে বড় আকারের দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করেছিল, যার ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়।

Featuring:
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সময় ব্রিটিশরা ভারতকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বিধ্বস্ত অবস্থায় রেখে যায়। তারপর থেকে…
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সময় ব্রিটিশরা ভারতকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বিধ্বস্ত অবস্থায় রেখে যায়। তারপর থেকে কৃষিক্ষেত্রে সবুজ বিপ্লব (খাদ্য), শ্বেত বিপ্লব (দুধ), হলুদ বিপ্লব (ভোজ্য তৈলবীজ) এবং নীল বিপ্লব (জলজ চাষ) ঘটেছে। এখন কৃষি ও সংশ্লিষ্ট খাতগুলি ভারতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, অবদানের দিক থেকে (২০২৩ সালে জিডিপির প্রায় ১৬%) এবং এই খাতে কর্মরত মানুষের সংখ্যার দিক থেকেও (২০২৩-২৪ সালে ৪৬.১%)। তবে অর্থনীতির ব্যাপক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কৃষির অংশ ক্রমাগত কমছে। ভারত কৃষিপণ্য উৎপাদনে দ্বিতীয় বৃহত্তম, কিন্তু চাষযোগ্য জমির পরিমাণে বৃহত্তম; ভারত ১২০টি দেশে প্রায় ৫২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি (অর্থবর্ষ ২০২৪-২৫) রপ্তানি করে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৃষি-রপ্তানির দ্বিগুণেরও বেশি, এবং এর ফলে ভারত কৃষিপণ্যের সপ্তম বৃহত্তম রপ্তানিকারক।

ভারত কলা, আম, পেয়ারা, পেঁপে ও লেবুসহ তাজা ফল; ঢেঁড়সসহ সবজি; দুধ; লঙ্কা ও আদাসহ মশলা; পাটসহ আঁশজাতীয় ফসল; মিলেট; এবং রেড়ির বীজসহ তৈলবীজ উৎপাদনে বিশ্বে প্রথম। গম ও ধানসহ প্রধান খাদ্যশস্য; শুকনো ফল; কৃষিভিত্তিক বস্ত্রশিল্পের কাঁচামাল; মূল ও কন্দজাতীয় ফসল; চাষ করা মাছ; ডিম ও মাংসসহ হাঁস-মুরগিজাত পণ্য; নারকেল; এবং আখ উৎপাদনে ভারত দ্বিতীয় বৃহত্তম। কফি ও তুলার মতো বহু অর্থকরী ফসলের ক্ষেত্রেও ভারত প্রথম পাঁচটি উৎপাদক দেশের একটি এবং অন্যতম প্রধান উৎপাদক।

এই খাতটি ভালো ফল করলেও গুদামজাতকরণ, সড়ক, বাজারে প্রবেশাধিকার, ন্যায্য অর্থায়ন এবং ক্রেতার কাছে পৌঁছানোর…
এই খাতটি ভালো ফল করলেও গুদামজাতকরণ, সড়ক, বাজারে প্রবেশাধিকার, ন্যায্য অর্থায়ন এবং ক্রেতার কাছে পৌঁছানোর মতো সহায়ক অবকাঠামো ৭০ বছর ধরে সমস্যা হয়েই রয়ে গেছে। তবে এর অনেক সমস্যা মোকাবিলায় ২০১৪ সালের পর বড় ধরনের কৃষি-সংস্কার শুরু হয়েছে। সর্বব্যাপী ইন্টারনেটের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে বেশ কয়েকটি কৃষি-সমষ্টিকরণ সংস্থা কৃষকদের নিজেদের পণ্য সরাসরি শেষ ক্রেতার কাছে বিক্রি করতে সক্ষম করেছে। তবুও খারাপ রাজনীতি, স্থানীয় দুর্নীতি এবং রাজ্যস্তরে অসম অবকাঠামো লক্ষ লক্ষ কৃষককে দারিদ্র্যসীমার নিচে ধরে রেখেছে। এছাড়া পাঞ্জাবের মতো রাজ্যে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহার হেক্টর প্রতি ফলন বাড়িয়েছে, কিন্তু ব্যবহারের প্রয়োজন বাড়ার কারণে উপকরণের খরচ বছরের পর বছর বাড়তে থাকায় লাভজনকতাও কমিয়েছে। সিকিম ২০১৬ সালে ১০০% জৈব হওয়া প্রথম ভারতীয় রাজ্য হয়, এবং একটি নীরব বিপ্লবও চলছে, যেখানে বিত্তবান ও আরও সচেতন ক্রেতারা রাসায়নিকমুক্ত পণ্যের দাবি করছেন।

Featuring:
ঔপনিবেশিক ও ঐতিহাসিক কারণে ভারতে জমির মালিকানা বেশ ছোট, যা অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের অনুকূল নয়। তাছাড়া, সেকেলে ব্রিটিশ আইন কৃষকের এই খাত ছেড়ে যাওয়ার এবং অ-কৃষকের এতে প্রবেশের সামর্থ্যকেও সীমিত করে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সমাজতন্ত্রভিত্তিক নেহরুবাদী নীতিও কৃষকের নিজের রাজ্যের বাইরে বিক্রির অধিকার সীমিত করেছিল। ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সোভিয়েত-ধাঁচের নীতিগুলি বহু বাঁধ তৈরি করেছে, যার ফলে নদী শুকিয়ে গেছে, স্থানীয় জলাধারগুলি জলহীন হয়েছে এবং কৃষি-খালগুলি অব্যবহৃত পড়ে আছে; এতে ভারত জলসংকটে ভোগা দেশে পরিণত হয়েছে এবং ভারতীয় কৃষককে ফসলের সাফল্যের জন্য বৃষ্টির উপর নির্ভরশীল করে তুলেছে। দেশি ও আন্তর্জাতিক উৎস থেকে আসা দূষণের কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত ও আবহাওয়ার ধরন বদলে দিয়েছে।

প্রযুক্তি প্রতিটি গ্রামে টেলিভিশন ও ইন্টারনেট পৌঁছে দিলেও তা আধুনিক সবকিছুর মালিক হওয়ার আকাঙ্ক্ষাও জাগিয়েছে।…
প্রযুক্তি প্রতিটি গ্রামে টেলিভিশন ও ইন্টারনেট পৌঁছে দিলেও তা আধুনিক সবকিছুর মালিক হওয়ার আকাঙ্ক্ষাও জাগিয়েছে। কখনও কখনও এর ফলে কৃষকেরা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা কেনা, বিয়ে দেওয়া, শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করা বা প্রিয়জনের চিকিৎসার খরচ মেটানোর জন্য প্রচুর ঋণ নিয়েছেন। এটি তাদের এমন ঋণের ফাঁদে ফেলে যা থেকে তারা বেরোতে পারেন না। স্থানীয় রাজনীতিকেরা ঋণ মকুব করে এবং প্রতিটি পরিবেশগত ঘটনায় ত্রাণ দিয়ে এই আচরণে উৎসাহ জুগিয়েছেন, যার ফলে ব্যাংকিং ও আর্থিক অবকাঠামো দুর্বল হয়েছে। কখনও কখনও চরম ঋণগ্রস্ত কিছু কৃষক আত্মহত্যা করেন।

সমসাময়িক নীতিগুলির লক্ষ্য এই ত্রুটিগুলি কাটিয়ে ওঠা: সহায়তার প্রত্যক্ষ জমা কর্মসূচির মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগীদের দুর্নীতি দূর করা, কোন ফসল লাভজনক হবে সে বিষয়ে আগাম তথ্য দেওয়া, সরকারের কাছে বিক্রি করলে ন্যায্য ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নিশ্চিত করা কিন্তু বেসরকারি ক্রেতাদেরও বেশি দাম দেওয়ার সুযোগ দেওয়া, আকর্ষণীয় অর্থায়ন প্রকল্প, স্থানীয় গুদামজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নতি, প্রাচীন জলপথগুলির পুনরুজ্জীবন, এবং কৃষির উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা। এর ফলে যারা এই অদক্ষতাগুলি থেকে মুনাফা করে এবং ধ্বংসাত্মক শক্তির সঙ্গে হাত মেলায়, তারা বিক্ষোভ করেছে। তবে সাম্প্রতিক নির্বাচন এবং সারা দেশে মানুষের প্রতিক্রিয়া স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে কৃষকেরা এই ধরনের সংস্কারই চান।

Featuring:











